জুন ২২, ২০২১
MIMS TV
অভিমত কোভিড ১৯ প্রিয় লেখক মু: মাহবুবুর রহমান স্বাস্থ্য

এ বছরই বিশ্ববাজারে আসছে করোনার টিকা ! কবে আসছে বাংলাদেশে

* মু: মাহবুবুর রহমান

শেষপর্যায়ে পরীক্ষায় থাকা করোনার টিকাগুলোর কি অবস্থা সে নিয়ে সর্ব প্রথমে সুখবর শুনিয়েছিল মার্কিন ওষুধ কোম্পানি ফাইজার। এর একদিন পর রাশিয়াও দাবি করে ছিলো তারাও পিছিয়ে নেই করোনা টিকা তৈরিতে। এর কয়েকদিন পর আরেক মার্কিন বায়োটেক ফার্ম মডার্না জানিয়েছিলো সফলতার কথা।  আর সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হলো ব্রিটিশ অক্সফোর্ডের টিকার সুখবর। ভবিষ্যতে হয়তো আরো সুখবর আসবে। কাজেই করোনা কবলিত বিশ্ব আশা করতেই পারে যে, করোনার ভ্যাকসিন আসছে অল্প দিনের মধ্যেই, হয়তো এ বছরের শেষে!

এই নভেম্বরে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যেসব সফলতার খবর পাওয়া গেলো তার দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেই।

–       ৯ ই নভেম্বর মার্কিন ওষুধ কোম্পানি ফাইজার ও জার্মান জৈব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বায়োনটেক জানিয়েছিলো তাদের যৌথভাবে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন করোনার বিরুদ্ধে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর।

–       তাদের ঘোষণার একদিন পর ১১ ই নভেম্বর রাশিয়া জানায় তাদের টিকা স্পুটনিক ভি ৯২ শতাংশ কার্যকর।

–       এরপর ১৬ ই নভেম্বর মর্ডানা ইনকর্পোরেশন জানায় তাদের তৈরি করোনার পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন কার্যকর ৯৪.৫ শতাংশ।

–       এরপর ১৮ ই নভেম্বর ফাইজার আবার জানায় তাদের টিকা করোনার বিরুদ্ধে ৯৫ শতাংশ কার্যকর।

–       সবশেষ ২০ শে নভেম্বর যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানি উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকার সফলতার খবরে বলা হয়, বয়স্ক মানুষের দেহে তাদের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকার প্রতিক্রিয়া ‘উৎসাহব্যঞ্জক’। বি বি সি জানায়, এই টিকা করোনা রোগের প্রাদুর্ভাব থামাতে পারবে কিনা, তা জানা যাবে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব বড়দিনের (২৫ ডিসেম্বর) মধ্যেই।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা অনেকটা নিশ্চিত যে অতি দ্রুতই আসছে করোনার টিকা, যার অপেক্ষায় আছে গোটা বিশ্ব। এতো গেলো করোনা টিকা বা ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সর্বশেষ, প্রশ্ন হলো করোনার টিকা কবে আসছে বাজারে আর কবে পেতে পারে বাংলাদেশ?

এ পর্যন্ত ফাইজার-বায়োএনটেক, স্পুটনিক, মডার্না ও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা এ চারটি টিকার সফল অগ্রগতি সম্পর্কে জানা গেছে। এ চারটি টিকার উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানেরই দাবি, করোনা মহামারী থামিয়ে দেবে তাদের তৈরি টিকা। যতটুকু জানা গেছে এ চারটি টিকার মধ্যে দামের দিক দিয়ে সবচেয়ে কম দাম হলো অক্সফোর্ড-আস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন বা টিকার আর সবচেয়ে বেশি দাম হলো মর্ডানা’র টিকার।

ফাইজার ও মডার্নার টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আবার তাপমাত্রার বাধ্যবাধকতা আছে। ফাইজারের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হবে। মডার্না জানায়, তাদের তৈরি টিকা রেফ্রিজারেটরে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। আর মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটা সংরক্ষণ করা যাবে ৬ মাস। স্পুটনিক ও অক্সফোর্ডের টিকার ক্ষেত্রে এ ধরনের তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পুটনিক ও অক্সফোর্ডের টিকা সংরক্ষণের জন্য অতি কম তাপমাত্রার প্রয়োজন নেই।

টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব দেশ টিকা উদ্ভাবন করেছে সে সব দেশের মানুষদের জন্য যে সর্বাগ্রে সরবরাহ করা হবে এটা তো বলাই যায়।  যেমন যুক্তরাজ্য সরকার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের আগেই অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের ১০ কোটি ডোজ ক্রয়ের অগ্রিম চুক্তি করেছে।ফাইজার ও মডার্না উদ্ভাবিত করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের ২০ কোটি ডোজ কেনার জন্য ইতোমধ্যে চুক্তি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জানা গেছে ফাইজার ও মডার্নার দু’টি ভ্যাকসিনের ছয় কোটি ডোজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য এবছরের ডিসেম্বর মাসেই পাওয়া যেতে পারে৷ আর রাশিয়া জানিয়েছে তাদের তৈরি স্পুটনিক ভি টিকা নিতে ২০টি দেশ থেকে ১০০ কোটির বেশি ডোজের আবেদন জমা পড়েছে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেলো যে দাম, টিকা সংরক্ষণ-ব্যবস্থা কিংবা চাহিদা’র বিবেচনায় করোনার  টিকা কখন যে বাংলাদেশে আসবে তা নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশে মাইনাস ২ থেকে ৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে কিন্তু মাইনাস ৬০ বা ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে টিকা সরবরাহ করার কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানা যায়। কাজেই দাম ও টিকা সংরক্ষণ-ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের উপযোগী টিকা হলো রাশিয়ার স্পুটনিক কিংবা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা।

বাংলাদেশেও অবশ্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা যাতে দ্রুত সময়ে পাওয়া যায় সেদিকেই হাটছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে তাদের যৌথ গবেষণাধীন টিকা উৎপাদনের চুক্তি করেছে। আর বাংলাদেশ চুক্তি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে। গত ৫ই নভেম্বর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মার সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনা ভাইরাস টিকার ৩ কোটি ডোজ  কিনবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক বলেন, এই টিকা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কেনা হবে এবং এ টিকা বিতরণ করা হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী। চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ যারা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনের সারিতে আছেন, তাদের এ টিকা প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে জানান তিনি। পর্যায়ক্রমে দেশের সবাইকে টিকার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে বলেও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কবে নাগাদ এ টিকা বাংলাদেশে আসতে পারে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে আসতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। যদিও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার পরীক্ষা ও অনুমোদনের পর্ব এখনও শেষ হয়নি।

প্রায় এক বছর ধরে প্রায় পুরো বিশ্বে করোনা মহামারি ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনে প্রথম এই প্রাণঘাতী ভাইরাস ধরা পড়ে। সবার আশা, এবছর ৩১ ডিসেম্বর আসার আগেই মানুষের হাতে চলে আসুক করোনা ঠেকিয়ে দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র – ভ্যাকসিন বা টিকা। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত চারটি টিকার সফলতার খবর সে লক্ষ্যে পৌঁছতে আমাদেরকে আরো আশাবাদীই করে।

* মু: মাহবুবুর রহমান, ফার্মাসিস্ট, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

Related posts

বাংলাদেশিদের টাকা কমেছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে

Irani Biswash

নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন আজ

শাহাদাৎ আশরাফ

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও আমরা

admin

Leave a Comment

Translate »