জুন ১৮, ২০২১
MIMS TV
অভিমত কোভিড ১৯ প্রিয় লেখক সুভাষ সিংহ রায় স্বাস্থ্য

কভিড-১৯ : ভ্যাকসিনের দাম নিয়েও ভাবতে হবে

বিশ্বের সর্বপ্রথম ভ্যাকসিনটি আবিস্কৃত হয় ১৭৯৬ সালে। এটি ছিল গুটি বসন্তের মতো এক ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন। পরবর্তীকালে নানাবিধ ভ্যাকসিনের কল্যাণে সারাবিশ্বে মানুষের অকাল মৃত্যুর হারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভবপর হয়েছে। একথা মানতেই হবে, করোনার ভ্যাকসিনে যত অগ্রগতি হয়েছে আর কোনো ভ্যাকসিন নিয়ে এতটা গবেষণা হয়নি। আমাদের জনগণের জন্যে টিকা প্রাপ্তি নিশ্চয়তার ব্যাপারে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই। সারা পৃথিবীতে অনেক উদ্যোগ এখন সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২ নভেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুসারে, বিশ্বজুড়ে করোনার ২১২টি সম্ভাব্য টিকা নিয়ে কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ৪৮টি মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। ৪৮টির মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন ও নোভাভ্যাক্স, চীনের সিনোভ্যাক, সিনোফার্ম ও ক্যানসিনো, জার্মানির কিওরভ্যাক এবং রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের টিকাগুলো নিয়ে সবচেয়ে আলোচনা চলছে। এগুলোর সবই মানবদেহে পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কভিড-১৯ সংক্রমণের একেবারে শুরুতে গ্লোবাল সিটিজেন তহবিলে ৫০ হাজার ডলার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স১ এনকোভ-২০১৯’ টিকাটি উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটিই মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি টিকার তিন কোটি ডোজ ক্রয় করতে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পেতে সিরামের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা। সিরাম ইনস্টিটিউট ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য পুনেতে অবস্থিত, এটি ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠান বছরে ১৩০ কোটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে বৃহদায়তনে পরিচালিত পরীক্ষণ কার্যক্রমে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে ২৩ নভেম্বর এ তথ্য জানানো হয়। বয়স্কদের মাঝে শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা অক্সফোর্ডের টিকা। গত ১৮ নভেম্বর ‘দ্য ল্যানসেট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষায় তথ্যে দেখা গেছে, কভিড-১৯ সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ ও মারা যাওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠীর মানুষের মাঝে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে অ্যাস্ট্রাজেনেকা অক্সফোর্ডের টিকা। ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স১ এনকোভ-২০১৯’ টিকাটি উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটিই মূলত বাংলাদেশে বৃহৎ বা মাঝারি পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন প্রয়োজন শুধু দরকারি অনুমোদনের।
সিএনএনের সূত্রে জানা যাচ্ছে, এক সপ্তাহের মধ্যে পরপর তিনটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সুখবর প্রকাশে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বৈশ্বিক আর্থিক ও বিনিয়োগ খাত-সংশ্নিষ্টরা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে সুখবরগুলোর স্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের সফলতার খবরে আটলান্টিকের দুই পাড়ের সব পুঁজিবাজারেই বড় উল্লম্ম্ফন দেখা গেছে।
ভ্যাকসিন কতটা নিরাপদ তা পরীক্ষার একটি প্রাথমিক গবেষণায় মডার্না ইনকরপোরেশনের কভিড-১৯ টিকা বয়স্কদের শরীরেও তরুণদের মতো ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি করে বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’ এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষকরা প্রতিবেদনে বয়স্কদের বেলায় মডার্নার টিকা কতটা নিরাপদ তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছেন। আগামী বছরের শুরুতেই মডার্নার ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন যুক্তরাজ্যের বাজারে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মডার্নার তৈরি ভ্যাকসিনের তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ সাফল্যের ঘোষণায় আশার আলো দেখছে জার্মানি। দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল আশা প্রকাশ করেছেন, অনুমোদন পেয়ে গেলে নভেম্বরের পরপরই বাজারে মিলতে পারে করোনার ভ্যাকসিন। আবার চলতি বছরের শেষ নাগাদ ফাইজার এনটেকের ৪ কোটি ডোজও বাজারে আসতে পারে বলে জানান তিনি।
ভ্যাকসিন এলেও সেই ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বিশ্ব কতটা প্রস্তুত এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অ্যান্টিভাইরাল প্রায় সব ভ্যাকসিনই শীতল অবস্থায় রাখতে হয়। ফাইজারের ভ্যাকসিন ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে। কিন্তু বিশ্নেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের পদ্ধতি যদি এতটাই স্পর্শকাতর হয়, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে তা সংরক্ষণ করবে। শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, এক দেশ থেকে আরেক দেশে টিকা পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রচলিত যে পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, তাতেও কোনো কাজ হবে না। ফলে টিকার গণউৎপাদনের পাশাপাশি বিশ্বের দেশগুলোকে নিজস্ব সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। ফাইজারের টিকা অন্তত মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে পরিবহনের সময়। অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে মিলে অক্সফোর্ডের তৈরি করা ‘চ্যাডঅক্স১ এনকোভ-২০১৯’ ভ্যাকসিন ফ্রিজের সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে। মডার্নার ভ্যাকসিন মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যাবে এবং তা ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। অপর দিকে রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক ভি ফ্রিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য।

আমরা বর্তমানে যে টিকাগুলো ব্যবহার করছি তার অধিকাংশই মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। অন্যদিকে মডার্না বলছে, সাধারণ ওষুধের দোকানে থাকা ফ্রিজেও তাদের টিকা সংরক্ষণ করা যাবে এবং তা ৩০ দিন পর্যন্ত থাকবে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট জি-২০ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারি ঠেকাতে আরও অনেক কিছুই করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ উন্নত দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন বলেন, ‘কোটি কোটি মানুষের জীবন হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতি সামলাতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সদিচ্ছা।’ ২৪ নভেম্বর সেরাম ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, ভারতে উৎপাদিত অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের দাম হবে প্রতি ডোজ ৪ ডলার। ডিসেম্বরের মধ্যেই ফাইজারের টিকার দাম ঘোষণা করা হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংস্থার প্রধান অ্যালবার্ট বোরলা। মডার্নার সিইও স্টিফেন ব্যানসেল জানিয়েছেন, করোনা টিকার একটি ডোজের দাম পড়বে ২৫ থেকে ৩৭ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। ভ্যাকসিনের দাম নিয়ে আলোচনা চলছে ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে। তাদের পক্ষ থেকে টিকার ডোজের দাম ২৫ ডলারের নিচে রাখতে বলা হয়েছে। উদ্ভাবন ও বিতরণের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের দাম নিশ্চয়ই বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার এখনই সময়।

* লেখাটি দৈনিক সমকাল থেকে সংগৃহিত

লেখক- রাজনীতিক; সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিল

Related posts

দেশে আবারো বেড়েছে করোনায় মৃত্যু সংখ্যা

শাহাদাৎ আশরাফ

বাংলাদেশ জরুরি টিকা চেয়েছে কানাডার কাছে

Irani Biswash

জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »