অগাস্ট ১, ২০২১
MIMS TV
অভিমত কোভিড ১৯ জীবনধারা নারী প্রবাস কথা প্রিয় প্রবাসী প্রিয় লেখক মু: মাহবুবুর রহমান

করোনা যোদ্ধা জেসমিন সুলতানা : ফ্রি মাস্ক বিতরণ করে যাচ্ছেন মানুষের মাঝে

মু: মাহবুবুর রহমান

বর্তমান বিশ্বে ভয়াবহ রূপ ধারণ করা মরনঘাতী করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে মাস্কের কোনো বিকল্প নেই। বলা হয়ে থাকে করোনা ভ্যাকসিন বা টিকা নেয়ার পরও মাস্ক পড়া বন্ধ করা যাবে না যতদিন না সবাই টিকা পায়। কাজেই মাস্ক পড়া অব্যাহত রাখতে হবে আরো বহুদিন, একথা বলা-ই যায়।

করোনার বিস্তার কমাতে বিশ্বের বহু দেশেই এখন মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক৷ নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে সবেগে বেরিয়ে আসা জলীয় বড় ড্রপলেটগুলো এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া ও কথা বলার সময় নিঃসৃত সূক্ষ্ম ড্রপলেট বা অ্যারোসল গুলোকে আটকে দেয় মাস্ক।

করোনা ভাইরাস ঠেকাতে মাস্ক হওয়া উচিত আমাদের কাপড় পরিধানের অনুষঙ্গ। সংক্রমিত ব্যক্তি ঠিকভাবে মাস্ক পড়লে, তার নাক, মুখ থেকে ড্রপলেট বেরোলেও তা মাস্ক আটকে দেয়। আক্রান্তের কাছাকাছি চলে আসা সুস্থ মানুষের পক্ষে তখন রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এ মাস্ক। অপরদিকে একজন সুস্থ মানুষ মাস্ক পড়লে একইভাবে করোনা আক্রান্তের মুখ-নাক নিসৃত ড্রপলেট হুট করে তার শরীরে ঢুকতে পারে না। সংক্রমণের আশঙ্কাও কয়েকগুণ কমে যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সতর্ক করা হচ্ছে, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ঘরের বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার বলে আসছে, ‘মাস্ক পড়লে ‘জীবাণু’র ড্রপলেট থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।’ বিজ্ঞানীরাও জানিয়েছেন, ‘করোনা ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়।’ তাই মাস্ক ব্যবহার খুবই জরুরি। মাস্ক সাধারণত কিনে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কেউ যদি মাস্ক ফ্রি সরবরাহ করে তবে নিশ্চয়ই তার সে কাজ প্রশংসার দাবিদার।  আর গত নয় মাস যাবৎ মানুষকে ফ্রি মাস্ক সরবরাহ করে যাচ্ছেন জেসমিন সুলতানা।

করোনার বিস্তার রোধে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। আরেক ধরণের যোদ্ধা আছে যারা ইউনিফর্ম না পরে, প্রকাশ্যে না এসে, লোকচক্ষুর আড়ালে কাজ করে যাচ্ছেন, তারাও নিশ্চয়ই করোনা যোদ্ধা। সেরকমই একজন করোনা যোদ্ধা – জেসমিন সুলতানা, যিনি এই বছরের মার্চ মাস থেকেই বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ করে যাচ্ছেন তার কমিউনিটি, ক্যালগেরি, কানাডাতে।

শুধু ক্যালগেরি, কানাডাতে নয়, জেসমিন সুলতানার তৈরি মাস্ক যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার মাস্ক নিজে তৈরি করে মানুষের কল্যানে মানুষের মাঝে ফ্রি বিতরণ করেছেন জেসমিন সুলতানা। তিনি সম্প্রতি কানাডা ভিত্তিক মীমস টিভি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর এ মাস্ক তৈরি ও বিতরণ অব্যাহত থাকবে ততদিন, যতদিন না এ দুনিয়া থেকে করোনা ভাইরাস বিদায় হয়।

জেসমিন সুলতানার তৈরী বিভিন্ন রকমের ফ্যাশনেবল মাস্ক

জেসমিন সুলতানা একজন করোনা যোদ্ধা যিনি গত নয় মাস ধরে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন মানুষের কল্যানে। জেসমিন সুলতানার একটি সংক্ষিপ্ত নাম আছে – পপি, যে নামেও তিনি অনেকের কাছে পরিচিত। ২০১৭ সালে তিনি আসেন কানাডাতে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স করার পর লন্ডনে ছিলেন অনেক দিন- প্রায় ১৩ বছর এবং সেখানে তিনি এমবিএ ডিগ্রি নেন।  লন্ডন থেকে কানাডার ক্যালগেরিতে এসে এখন তিনি ক্যালগেরি তথা গোটা বিশ্বের মানুষের কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনা মহামারির শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মাস্কের হঠাত্ দুষ্প্রাপ্যতার প্রেক্ষিতে সে দেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এ বছরের এপ্রিল মাসে কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহারের পক্ষে সুপারিশ করে। তারা জনগণকে কাপড় দিয়ে নিজেদের মাস্ক নিজেরা কীভাবে তৈরি করবে—তাও প্রচার করে। সিডিসি জানায়, মাস্ক হতে হবে তিন স্তর বিশিষ্ট একটু মোটা ধরনের। আর জেসমিন সুলতানা কাপড় দিয়েই মাস্ক তৈরি করেন এবং তাঁর তৈরি মাস্কও তিন স্তর বিশিষ্ট।

সাক্ষাৎকারে জেসমিন সুলতানা বলেন, “আমি কোনো স্বার্থ নিয়ে মাস্ক ফ্রি বিতরণ করছি না।  আমার স্বার্থ একটাই আগে আমি, আমরা বাঁচি। প্রথমে মানুষ বাঁচুক, আজকে যদি আমি না বাঁচি তাহলে সবকিছুই পড়ে থাকবে। সবাইকে নিয়ে বাঁচার মধ্যেই তো সার্থকতা।“  মাস্ক তৈরির খরচের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অবশ্যই খরচ আছে কিন্তু খরচটা আমি নিজেই বহন করছি।“ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন জেসমিন সুলতানা Style Loft Jasmine নামে একটি অনলাইন ফ্যাশন বিজনেস চালান। মাস্ক তৈরির কাপড় তিনি তাঁর ফ্যাশন হাউজ থেকে সংগ্রহ করেন।

ফ্রি মাস্ক বিতরণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথম দিকে তিনি তাঁর কমিউনিটিতে মাস্ক বিতরণ শুরু করেন। কমিউনিটির লোকজন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না যে, তাঁরা ফ্রি মাস্ক পাবে, এমনকি অনেকে বানানোর খরচটা নেয়ারও অনুরোধ করেন বলে জানান জেসমিন সুলতানা। তবে তিনি তাদেরকে বানানোর খরচ না নিয়েই মাস্ক বিতরণ করেছেন এবং এখন পর্যন্ত তা অব্যাহত রেখেছেন।

জেসমিন সুলতানা পপির তৈরি মাস্ক শুধু কানাডাতে না, আমেরিকা, ভারত ও তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে পুরোটাই ফ্রি, এমনকি মাস্ক পাঠানোর খরচও তিনি বহন করছেন বলে জানান। বিজয়ের এই ডিসেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশের পতাকার রং অর্থাৎ লাল সবুজের সংমিশ্রনে মাস্ক বানিয়েছেন বলেও জানান।

আপনিও চাইলে আপনার নিজের কিংবা আপনার কমিউনিটির জন্য জেসমিন সুলতানা পপির তৈরি মাস্ক পেতে পারেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাঁর অনলাইন ফ্যাশন বিজনেস Style Loft Jasmine এ গিয়ে আপনার কত মাস্ক প্রয়োজন তা জানাতে পারেন। কিংবা তাঁর সাথে ইমেইলেও যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁর ইমেইল এড্রেস: poppy1188@hotmail.co.uk

পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা নীরবে, নিভৃতে মানুষের কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন। জেসমিন সুলতানা তেমনই একজন যিনি অনেকটা নীরবেই ফ্রি মাস্ক বিতরণ করে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁর কাজগুলো প্রচার হোক তাও তিনি তেমন একটা চাননা। তিনি বলেন, “যখন জানলাম যে, এই করোনা কালীন সময়ে মাস্কটা অনেক বেশি উপকারী তখন থেকেই  মানুষের কল্যানে একটু কন্ট্রিবিউট করার আশায় শুরু করি মাস্ক বানানো। আমি তো ডাক্তার, নার্স না, তাহলে আমি মানুষের জন্য কী করতে পারি সেরকম একটা ভাবনা থেকেই শুরু মাস্ক বানানো।  যেটা আমি করে যাচ্ছি গত নয় মাস যাবৎ এবং করে যাবো যতদিন না এই পৃথিবী করোনা মুক্ত হয়।”

# মু: মাহবুবুর রহমান ; নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

Related posts

মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় বিষয়ে আগ্রহী না: লি জিমিং

Irani Biswash

জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতি

Irani Biswash

করোনা আপডেট, মৃত্যু ২৬

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »