অগাস্ট ৫, ২০২১
MIMS TV
এই মাত্র পাওয়া কোভিড ১৯ প্রিয় লেখক ব্রেকিং নিউজ মু: মাহবুবুর রহমান স্বাস্থ্য

এফডিএ অনুমোদনপ্রাপ্ত ফাইজার ও মডার্নার করোনা টিকা : মিল-অমিল

মু: মাহবুবুর রহমান 

করোনা মহামারী থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সবার দৃষ্টি ছিলো একটি কার্যকর ভ্যাকসিন বা টিকার দিকে। সে লক্ষ্যে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই ডিসেম্বরে এসেছে দারুণ দুটি সুসংবাদ। কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষায় প্রথম ভ্যাকসিন হিসেবে ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি করোনার টিকা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদন পায় ১১ই ডিসেম্বর। এর এক সপ্তাহের মাথায় দ্বিতীয় ভ্যাকসিন হিসাবে মর্ডার্নার ভ্যাকসিন এফডিএ অনুমোদন দেয় ১৮ই ডিসেম্বর।

করোনা টিকা অনুমোদনের পর খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) প্রধান স্টিফেন হান বলেন, “কোভিড-১৯ প্রতিরোধে এখন দুটি ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতার মধ্য দিয়ে এফডিএ বিশ্ব মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল।“ করোনা মহামারী ঠেকাতে এফডিএ অনুমোদনপ্রাপ্ত ফাইজার ও মডার্নার তৈরি করোনা টিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে নাকি নেই তাই নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে।

দুই টিকা কিভাবে কাজ করে

ভ্যাকসিন বা টিকা হচ্ছে এমন প্রতিষেধক যা দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে সংক্রামক জীবাণুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তার জন্য হয় নিষ্ক্রিয়/মৃত ভাইরাস বা তার কোনো অংশকে ল্যাবরেটরিতে বিশেষ উপায় পরিশুদ্ধ করে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কাজ হয় অনেকটা বিষে বিষে বিষক্ষয়ের মতো। ভাইরাল প্রোটিন শরীরে ঢুকলেই, শরীর তার প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি নিজেই তৈরি করতে পারে।

উপরোক্ত প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে ফাইজার ও মডার্নার টিকা দুটি তৈরিতে মেসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। এমআরএনএ হলো কোষের বার্তাবাহক। কোন কোষে কী প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, কোথায় কী রাসায়নিক বদল হচ্ছে সবকিছুর জিনগত তথ্য বা ‘জেনেটিক কোড’ জোগাড় করে সেটা শরীরের প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছে দেয়া তার কাজ। এমন বার্তাবাহক এমআরএনএ-কে ভ্যাকসিন তৈরির ভিত হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।

এমআরএনএ ভ্যাকসিনের কাজ হলো শরীরের কোষগুলোকে অ্যান্টি-ভাইরাল প্রোটিন তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়া। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানী বব ল্যাঙ্গার বলেছেন, বাইরে থেকে প্রোটিন-ড্রাগ ইনজেক্ট না করে, এমআরএনএ ভ্যাকসিন দিয়ে যদি কোষের মধ্যেই ভাইরাস-প্রতিরোধী প্রোটিন তৈরি করা যায়, তাহলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক বাড়ে। আর এই পদ্ধতির ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে ফাইজার ও মডার্নার টিকা দুটি।

আবার করোনা ভাইরাস আদতে একটি আরএনএ ভাইরাস। আর আরএনএ ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়েছে এমআরএনএ ভ্যাকসিন।  এ ভ্যাকসিনে এমআরএনএ সিকুয়েন্সকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যাতে দেহকোষে ঢুকলে সেটি ভাইরাল প্রোটিনের মতো প্রোটিন তৈরি করতে কোষকে উদ্দীপ্ত করতে পারে। ভ্যাকসিনে থাকা জিনের বিন্যাস দেখে দেহকোষও একই রকম স্পাইক প্রোটিন তৈরি করবে। তখন সেই প্রোটিনকে ঠেকাতে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।

অন্যভাবে বলা যায়, এমআরএনএ প্রযুক্তি আসলে করোনা ভাইরাসের একটি অংশের ব্লুপ্রিন্ট বা প্রতিচিত্র৷ মানুষের শরীরের কোষ সেই ব্লুপ্রিন্ট কার্যকর করে ভাইরাসের একটি অংশ তৈরি করবে৷ শরীরে নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাইরাসের এই সব অংশকে সমস্যা বা অ্যান্টিজেন হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে।

কাদের উপর প্রয়োগ করা যাবে

ফাইজার-বায়োএনটেক টিকা ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সের হলেই প্রয়োগ করা যাবে। আর মডার্নার টিকা দেয়া যাবে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়স্কদের।

গর্ভবতী নারী কিংবা যারা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদেরকে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন ট্রায়াল থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো, অর্থাৎ, তাদের জন্য ভ্যাকসিনগুলোর সুরক্ষা সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য জানা নেই।

কার্যকারিতা ও ডোজ

করোনাভাইরাস ঠেকাতে দুটি টিকা প্রায় একই রকম কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফাইজার ও বায়োএনটেকের টিকাটি পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। মডার্নার টিকাটি ৯৪ শতাংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

দুটি টিকাই দুই ডোজ করে দিতে হয়। এর মধ্যে ফাইজারের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয়টি ডোজের জন্য ২১ দিন (তিন সপ্তাহ) আর মডার্নার ক্ষেত্রে ২৮ দিনের (চার সপ্তাহ) বিরতি দিতে হয়।

সংরক্ষণ ও বিতরণযোগ্যতা

ফাইজার-বায়োএনটেক জানিয়েছে সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার  প্রয়োজন হবে এবং একবার গলানো হলে এটি কেবল পাঁচ দিন রেফ্রিজারেটরে রাখা যাবে। এ ছাড়া টিকা পরিবহনের জন্য শুষ্ক বরফযুক্ত বিশেষ কনটেইনারের প্রয়োজন। অন্যদিকে মডার্নার টিকাটি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছয় মাস পর্যন্ত থাকবে। একবার গলানো হলে এটি রেফ্রিজারেটরে এক মাস পর্যন্ত রাখা যাবে। ফলে এই টিকা স্থানান্তর করা সহজ।

এই দুই ভ্যাকসিনের তুলনা করলে দেখা যায়, ফাইজারের টিকাগুলি হাসপাতালের মত প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো ও বড় প্রতিষ্ঠানে বেশি ব্যবহৃত হবে। অন্যদিকে স্থানীয় চেইন বা ফামের্সির মত ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানেও মডার্নার টিকা ব্যবহার করা যাবে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

দুটি টিকার ক্ষেত্রেই বড় আকারের পরীক্ষা (ট্রায়াল) চালানোর সময় কোনো মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে সামান্য স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ফাইজার ও মডার্নার টিকা দুটি অবশ্য সরাসরি তুলনা করে দেখা হয়নি। তবে মডার্নার টিকায় কিছুটা বেশি মাত্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেয়ার পর প্রথম দিন বা দ্বিতীয় দিনে ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও জ্বরের উপসর্গ দেখা যায়। ৬৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে এ উপসর্গ বেশি দেখা যায়।

ফাইজারের টিকা মানবদেহে পরীক্ষার পর্যায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এই টিকার ব্যবহার শুরুর পর কিছু ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গুরুতর অ্যালার্জি র খবর  পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে দুজন ও আলাস্কায় একজন স্বাস্থ্যকর্মী ফাইজারের টিকা নেয়ার পর অ্যালার্জির কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বলা হয়েছে, যাঁদের অ্যানাফাইল্যাক্সিস বা কোনো খাবার বা ওষুধে গুরুতর অ্যালার্জি সমস্যা রয়েছে, তাঁরা যেন এ টিকা না নেন।

যুক্তরাষ্ট্রে টিকা দেয়ার পর লোকজনকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধাঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে। এটা করা হচ্ছে কোনো তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া হয় কি না, তা দেখার জন্য।

দামের পার্থক্য

ফাইজার-বায়োএনটেক জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ২০ ডলার করে। অন্যদিকে মডার্না জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ২৫ থেকে ৩৭ ডলার করে। তবে দুটি কোম্পানির কেউই ভ্যাকসিন দুটির প্রকৃত দামের কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি।

কতদিন সুরক্ষা দেবে ফাইজার ও মডার্নার করোনা ভ্যাকসিন

একবার ভ্যাকসিন দিলে কোভিড-১৯ আবার হবে কিনা ব্যাপারটি এখনও অজানা। অর্থাৎ কোভিড-১৯ টিকা আমাদের কতদিন পর্যন্ত সুরক্ষা দেবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছুই জানায়নি ফাইজার-বায়োএনটেক কিংবা মডার্না। এমন হতে পারে, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো প্রতি বছর টিকা নেয়ার দরকার হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এটা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে বলে জানা গেছে।

তবে সে যাই হোক যেহেতু এখন পর্যন্ত এফডিএ অনুমোদনপ্রাপ্ত করোনা টিকা মাত্র দুটি – ফাইজার ও মডার্নার টিকা আর তাই এ দুই প্রতিষ্ঠানের টিকা গ্রহণ ভিন্ন অন্য কোনো বিকল্প এখন পর্যন্ত নেই। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও তার স্ত্রী কারেন পেন্স প্রকাশ্যে ফাইজারের কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়েছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ ও বারাক ওবামা- তিনজনই জানিয়েছেন, প্রকাশ্যে করোনার টিকা নিতে তাদেরও কোনো আপত্তি নেই । বরং সবার সামনে টিকা নিয়ে দেশবাসীকে উৎসাহিত করতে চান তারা। চান করোনা টিকা নেয়ার ভয় দূর করতে। কারণ করোনা মহামারি ঠেকানোর প্রধানতম কিংবা একমাত্র উপায় যে টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ।

মু: মাহবুবুর রহমান ; ফার্মাসিস্ট, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

Related posts

গোপনে কোচিং বানিজ্য, জরিমানা ৬০ হাজার টাকা

Mims tv : Powered by information

বিশ্বে করোনা আক্রান্ত ১৫ কোটি ছাড়াল: গত ১২ দিনে আক্রান্ত এক কোটি

Mims tv : Powered by information

করোনায় সাবধানতা জরুরি

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »