অগাস্ট ১, ২০২১
MIMS TV
আখতার হোসেন খান প্রিয় লেখক বিনোদন সাহিত্য

চাঁন মোহনের খেয়া

আখতার হোসেন খান

চাঁন মোহন হিন্দু মানুষ । তাইতো ভয়টাও বেশি। পাকসেনারা হিন্দু জানতে পারলেই তাকে আর বাঁচিয়ে রাখে না। সোজা গুলি চালায় বুকে। তাই তো খেয়া নৌকা আর ঘাট ফেলে চলে গেছে সে।

এ ঘাটের খেয়া নৌকার মাঝি এখন সাদিক। সাদিক কেনো খেয়া ঘাটের মাঝি হলো সে গল্পটা শুনেন। সাদিক দূরন্ত এক কিশোর। বুকের ভেতর তার অনেক কষ্ট। সেই কষ্ট বুকে চেপে প্রতিশোধের নেশায় ঘুরছে সে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য চাঁন মোহনের খেয়াকে বেছে নেয় সাদিক।

তারিখটি ছিলো ১১ আগস্ট।

পাক বাহিনীর অস্ত্র ভর্তি দু’টি জাহাজ যমুনা নদী দিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছিল জামালপুর জেলার কামালপুরের দিকে। যেখানে মুক্তি যোদ্ধারা কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ যাবে কামালপুরের যুদ্ধে। জাহাজের সারেং চট্টগ্রামের গোলাম মোস্তফা। জাহাজ দু’টি যমুনা নদীর ধলেশ^রী নদীর মুখে সিরাজকান্দী চরে আটকে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেয় সে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র বোঝাই জাহাজে আক্রমণ করে। তখন পাকসেনারা স্পিডবোট নিয়ে যমুনার পশ্চিম তীরের সিরাজগঞ্জের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তি যোদ্ধারা অস্ত্রগুলো নৌকায় তুলে নিয়ে জাহাজ দু’টিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। বিকট শব্দে আকাশ পর্যন্ত ওঠে আগুনের লেলিহান শিখা। যমুনার চরে জ্বলছে পাকিস্তানের জয়ের পতাকা। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় উল্লাসে পাকিস্তানীদের স্টেনগান, মর্টার, এলএমজি নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যায়।

পরের দিন পাকিস্তানী সৈন্যের বহর নেমে আসে এলাকায়। নির্বিচারে গণহত্যা আর বাড়িঘর জ¦ালিয়ে দিতে থাকে। ধরে নিয়ে যায় সুন্দরী মেয়ে আর গৃহবধূদের। বাড়িতে দু’জন যুবতী সুন্দরী মেয়ে। চাচাতো বোন জনি এবং নিজের বোন সনি।

বাবা আর চাচা মিলে তাদেরকে পাট শোলার খাড়া মোটের ভেতরে খোলা জায়গায় বসিয়ে রাখলেন আর বলে দিলেন, তোমরা কোনো শব্দ করবা না, তাইলে আর্মিরা ধইরা নিয়ে যাবোগা। তারা বসে বসে আল্লাহ আল্লাহ করছে। অন্তত: বাড়িতে আগুন যেনো না দেয় আর্মিরা! আগুন দিলে মেয়ে দু’টি ওখানেই পুড়ে মরবে।

কিশোর সাদিক বাবার হুক্কা সাজিয়ে আনে। বাবা আর চাচা মিলে ওঠানে বসে হুক্কা টানছে। এমন সময় পাকসেনা এসে রাইফেল তাক করে দু’জনের বুকে।

– মুক্তি কিয়া হ্যায়?

– আমরা জানি না। মুক্তি নেহি সাব।

– তোমরা মুসলিম হ্যায়, নাকি মালাউনক্যা বাচ্চা?

– আমরা মুসলিম সাব।

– কলেমা বাতলাও?

বাবা আর চাচা দু’জনে এক সাথে চার কালেমা বলতে শুরু করে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদিক। কালেমা শুনেও বিশ্বাস করে না পাক সেনারা। হেচকা টান দিয়ে পরনের লুঙ্গী খুঁলে ফেলে। ছোট ছেলের সামনে এমন বেইজ্জত করায় লজ্জায় মাটিতে মিশে যায় তারা। এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মাঝে যেনো কোনো পার্থক্য নেই। খৎনা করতা হ্যায়-বলে রাইফেলের বাট দিয়ে কয়েকটি বাড়ি দিয়ে চলে যায় পাকসেনারা।

রাগে দুঃখে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে সাদিক। এর প্রতিশোধ না নিয়ে ঘরে ফিরবে না সে। সে চলে যায় চাঁন মোহনের খেয়া ঘাটে। ঘাটের মাঝি সেজে লোকজন পারাপার করে। কিছু কিছু পয়সাও পায়।

তখন পড়ন্ত বিকেল। পাকসেনাদের একটি দল ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের দেখে মনে মনে খুশি হয় সাদিক। সবাইকে একসাথে তুলতে হবে খেয়া নৌকায়। দ্বিতীয় বার তোলার সুযোগ নেই। অবশ্য নৌকাটি অনেক বড়। হাটুরেদের পারাপার করতে বড় নৌকা লাগে। তাও মাঝেমাঝে তাড়াহুড়ো করে ডুবিয়ে দেয় হাটুরেরা। একসাথে একদল নামে আর একদল ওঠে। তখনই ডুবে যায় খেয়া। সাদিক অনেক বার দেখেছে ডুবতে। চাঁন মোহন কাকা আবার দড়ি দিয়ে টেনে নৌকা ঘাটে এনে হেমৎ দিয়ে সেচে তখনই তুলে ফেলে।

সাদিকদের গ্রামের তিন দিকেই নদী। লৌহজং নদী। পাকসেনারা পাশের গ্রামে যেতে চাইলে অবশ্যই খেয়া নৌকায় লৌহজং নদী পার হতে হবে। নদীর উত্তর পাড়ে নৌকা নিয়ে বসে আছে সাদিক।

দক্ষিণ দিক থেকে পাকসেনাদের দশ-পনেরো জনের একটি দল ডাকছে। সাদিক খেয়া বেয়ে আসে আর মনে মনে ফুসতে থাকে সেই সাথে খুশিও হয়। এটাই তোদের শেষ যাত্রা শইতানের বাচ্চারা! আমার বাবার গায়ে হাত দিছো, বাবার লুঙ্গী খুঁইলা নেংটা করছো, আমি তার প্রতিশোধ নিমু না কি, কুত্তার বাচ্চারা?

একবার খালি খেওয়া নাওডা মাঝ নদীতে নিবার দ্যাও, তারপর দ্যাহ কি করি? রাগে গড় গড় করে সাদিক। কিন্তু প্রকাশ পায় না।

সাদিক বয়সে কিশোর হলেও কঠিন একটি ষড়যন্ত্র করে রেখেছে। নদীর খেয়া ঘাটের ভাটিতে দুই পাড়ে পলি মাটি পড়েছে। বুক সমান পলিমাটি। সেখান থেকে ওঠে আসার কোনো উপায় নেই। এটিই উপযুক্ত স্থান। এছাড়া বৈঠার হরা (দড়ি) অর্ধেক কেটে রেখেছে সে। নৌকার পেছনের দিকে ডবড়া খোপের তক্তা কেটে হাল্কা করে আটকে রেখে দেয়, যাতে সামান্য লাথি খেলে তক্তা খুঁলে যায়। নৌকা সেচার হেমৎটি আগেই ভাসিয়ে দিয়েছে সে।

এবার ঘাটে খেয়া নৌকা এনে ভিরিয়ে দেয় সাদিক। পাকসেনাদের দলটি নৌকায় ওঠে যার যার মতো বসে পড়ে নৌকার মাচাইলে। বোতল বের করে জল খায়। এবার নৌকা ছেড়ে দেয় সাদিক। আস্তে আস্তে বৈঠা টানে সে। নৌকা ঘাট ছেড়ে ভাটির দিকে যেতে থাকে।

– এই খোকা জোড়ছে টানো?

– জি, সাব,

মনে মনে খুশি হয় সাদিক। জোরে তো টানমুই তবে মাঝ নদীতে যাইয়া। বৈঠায় একটা মাত্র টান দিমু, তারপর কেল্লা ফতেহ !

– জোড়ছে টানো, নাও ভাটিতে চলে যেতে হ্যায়!

– জি সাব। বলে মাথা নাড়ে সাদিক। নৌকা এবার মাঝ নদীতে। প্রবল স্রোতের মাঝে। এখনই সুযোগ! বৈঠার কাটা হরার দিকে একবার দেখে নেয় তারপর নায়ের ডবড়া খোঁপের কাটা তক্তার দিকে চেয়ে দেখে সাদিক। সব ঠিকই আছে। তারপর বৈঠায় একটা হেচকা টান মারে সে। হরা ছিঁড়ে সে ছিটকে পড়ে ডবড়া খোঁপে । আর সাদিককে দেখা যাচ্ছে না। চেয়ে চেয়ে দেখে চিৎকার দেয় পাক সেনারা- নাওয়ের তলা বি নেহি! নায়েরমাঝি ডুবে যেতে হ্যায়!

তাদেরও আর কিছুই করার নেই। নৌকার হাল নেই, মাঝি নেই, তলাও নেই। ইয়া আল্লাহ,ইয়া আল্লাহ রহম করতা হ্যায় বলে চিৎকার করতে করতে একজন আরেক জনকে জড়িয়ে ধরে পাক সেনারা। জল ওঠতে ওঠতে মাঝ নদীতে তলিয়ে যায় চাঁন মোহনের খেয়া।

 

Related posts

করোনা শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে একদিনে সর্বোচ্চ ৫১৮১ রোগী শনাক্ত

Mims tv : Powered by information

হাসপাতালে ভর্তি বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার

Irani Biswash

আরব আমিরাতে শত গল্প নিয়ে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’র প্রকাশনা উৎসব

শাহাদাৎ আশরাফ

Leave a Comment

Translate »