অগাস্ট ৪, ২০২১
MIMS TV
জীবনধারা

আইসল্যান্ড

প্রথম পর্ব  : (প্রারম্ভিকতা এবং Reykjavik শহরের বিখ্যাত চার্চ Hallgrimskirkja , সাথে লাভা ফিল্ড এবং Blue Lagoon এর গল্প) 

জাহিদ হক
কানাডার ক্যালগারি শহর থেকে চার ঘন্টার ফ্লাইটে প্রথম স্টপ টরন্টো শহরে।কানাডা থেকে বাইরে ট্রাভেল করার জন্য মাঝে মধ্যে কিছু কিছু ফ্লাইটের সস্তায় ডীল থাকে। এবারে এয়ার-কানাডা এয়ারলাইন্স অপেক্ষাকৃত ভালো একটা ডীল দিলো এবং যথারীতি ভ্রমণের লোভ সামলাতে না পেরে টিকেট কেটে ফেলা হলো হুটহাট। টরন্টোতে বেশ লম্বা দশ ঘন্টার একটা লেওভার।এয়াপোর্টে নেমেই পুরোনো আড্ডাবাজ বন্ধু আরাফাত এবং নাইমকে ফোন দিলাম। শুনেই একেবারে এয়ারপোর্টে এসে হাজির।
পুরনো দোকানে বিগত আড্ডা
বিগত ঝগড়া বিগত ঠাট্টা
বন্ধু কি খবর বল
কত দিন দেখা হয়নি
এভাবে বিগত আড্ডা আর ঠাট্টায় অনেকটা সময় কেটে গেলো। আইসল্যান্ড পৃথিবীর ব্যায়বহুল দেশটির মধ্যে একটি। এমনিতে পকেটে টাকা পয়সা তেমন একটা থাকে না। ভ্রমণ নেশার জন্য অনেক কষ্টে সৃষ্টে খরচটা ম্যানেজ করতে হয়, আবার ঘুরাঘুরির সময় কোনো কিছু যাতে বাদ না পরে, সেটাও ম্যানেজ করতে চেষ্টা করি। আইসল্যান্ডে সাধারণ একটা বার্গারের দাম আনুমানিক পঁচিশ মার্কিন ডলার। বাকি খাবার দাবার ভেবে দেখুন ! এখানে খাবার দাবার অনেক দূর থেকে আমদানি করতে হয়, ফলে ট্রান্সপোর্টেশন আর খাবারের দাম দুইয়ে মিলে একেবারে গগনচুম্বী। সব দর্শনার্থীদের আইসল্যান্ডের খরচের বেপারটা জানা আছে। তাই খাবারের প্ল্যান বলতে গেলে অর্থ সাশ্রয়ী খাবার যেমন পিনাট বাটার স্যান্ডউইচ, আর টুকটাক ফলমূল। সম্পূর্ণ সাত দিনের ট্রিপের জন্য অনলাইনে গাড়ি রেন্ট করে রেখেছি। মূলত গাড়ির মধ্যেই লাঞ্চ, আর রাতের বেলায় হোস্টেলে । টুকটাক নুডুলস অথবা স্প্যাগেটি রান্না, আর সকালে কফি, নাস্তা এসব। ভোজন বিলাসী দেশে যেমন সেদেশের রকমারি খাবার দাবার উপভোগ করা একটা মজার অভিজ্ঞতা, তেমনি ভোজন-বেরসিক দেশেও টুকটাক খেয়ে দিনের পর দিন কাটানো একটা অভিজ্ঞতা। এই দুই অভিজ্ঞতা বেশ ভালো ভাবে রপ্ত করে নিয়েছি। তাই কোনোটাতেই তেমন কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়না।
আগামী সাতটা দিন এইভাবে থাকতে হবে, তাই যাবার প্রাক্কালে টরোন্টর এই লেওভারে সবাই মিলে ছুটলাম একটা মালয়েশিয়ান রেস্তুরাঁর দিকে , পেটপুজো করতে। খাবার দাবার শেষ করে ছুটে চললাম টরন্টো পিয়ার্সন এয়ারপোর্ট। টরন্টো থেকে সাড়ে পাঁচ ঘন্টার ফ্লাইট। ফ্লাইটে বসে রীতিমতো ঘুম। প্লেনের ভাগ্যটা একঘেয়ে , প্রায়শই প্লেনে আমাকে বসতে হয় দুইজনের মাঝে। না জানলা দিয়ে তাকিয়ে উদাস ভাব নেয়া , না অন্য পাশে পা টানটান করার সৌভাগ্য। কোনোটাই মিলে না। চার ঘন্টার স্ট্যাচু মার্কা ঘুম ভাঙলো আইসল্যান্ডের রাজধানী রেকাভিক (ইংরেজিতে লেকে Reykjavik, কিন্তু উচ্চারণে রেকাভিক) এয়ারপোর্টে। ইমিগ্রেশনে তেমন একটা লাইন ছিল না আর তেমন কোনো জিজ্ঞাসাবাদও হয়নি। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই আইসল্যান্ডের ওয়েদার সম্পর্কে যা শুনেছিলাম ঠিক ওরকমই। বেশ গুমোট এবং উইনডি। এয়ারপোর্ট থেকে Shuttle নিয়ে আসতে হলো গাড়ি রেন্টাল অফিসে।
অনলাইনে আগেই গাড়ী বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছিল। রেন্টাল অফিসে সুটকেস,লাগেজ নিয়ে অনেক লোকজনের ভিড় এবং লম্বা ওয়েটিং। অবশেষে গাড়ির চাবি হাতে পেলাম। ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের কার রেন্টাল ইন্সুরেন্স থাকায়, রেন্টাল অফিস থেকে ইন্স্যুরেন্স আর নিলাম না, যদিও তারা খুবই জোরাজোরি করে ইন্স্যুরেন্স নেয়ার জন্য । ছোটোখাটো একটা গাড়ি , গাড়ি নিয়ে সোজা হোস্টেলে।
হোস্টেলের ডেস্কে হাস্যউজ্জল কর্মরত এক মেয়ে। উদার এবং বন্ধুত্বপরায়ণ আচরণে মনে হচ্ছিলো আমরা একসাথে একই পাড়ায় বড়ো হয়েছি।হোস্টেলের চেকইন টাইম যদিও বিকেল তিনটায়, রুম ফাঁকা থাকায় আগেই চেকইনের ব্যবস্থা করে দিলো। বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুমের অতল গহ্বরে, এলোমেলো সব তাজা তাজা স্বপ্ন। আর একটু ঘুমোতে পারলে হয়তো ভালো হতো। কিন্তু এইদিকে আবার রাত আটটার টিকেট নেয়া ছিল থার্মাল বাথ ব্লু-লেগুনের (Blue Lagoon)। বের হয়ে গ্রোসারি থেকে টুকটাক কিছু কেনাকাটা করে নিলাম , কিছু ফলমূল, স্পেগেটি , চিপস , মিক্সড বাদাম, কলা , আপেল এইসব। হোস্টেলে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। হোস্টেল বলতে একটা দোতালা বাসাবাড়ি। তাতে বেশ কয়েকটা রুম, এবং এক একটা রুমে দোতালা বেড কয়েকটা। আমি যে রুমে ছিলাম ওখানে তিন টা দোতালা বেড। জানালার পাশে এক কোনায় নিচ তলার বেডটাতে ঢুকে পড়লাম। উপরের বেডে যাবার জন্য একটা ছোট্ট সিঁড়ি দেয়া।
নানান দেশের নানান দর্শনার্থীর ভিড় এখানে। শোবার ঘরের বাইরে ব্যাপক আড্ডা।কিন্তু শোবার ঘরে একদম চুপচাপ, হোস্টেলের বেডরুম গুলো কেবল মাত্র ঘুমের জন্য। হৈচৈ করা একদম নিষেধ, সবাই খুব সতর্কতার সাথে হোস্টেলের নিয়মকানুন মেনে চলে। বিড়াল হাঁটার মতো চুপ চুপ রুমে ঢুকে যার যার বিছনায় পর্দা দিয়ে ঘুমিয়ে পরে।
আইসল্যান্ডে মধ্য – মে থেকে মধ্য – অগাস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সূর্য কেবল ৩ ঘন্টার জন্য ডুবে। আর এখন অগাস্ট শেষ, প্রায় সেপ্টেম্বর ছুঁই ছুঁই, সূর্য্য মোটামোটি নয়টা কি সাড়ে নয়টার মধ্যে ডুবে যায়। যদিও সূর্য্য উঠা দেখার সুযোগ এখনো হয়নি। ভোর ছয়টার টার দিকে উঠে যায়।
সন্ধ্যাটা রাজধানী শহর Reykjavik-এ কাটানোর প্ল্যানে বের হয়ে পড়লাম। শহরের কেন্দ্রেই রয়েছে আইসল্যান্ডের বিখ্যাত এবং আকর্ষণীয় চার্চ হ্যাকগ্রিমসকিরকা (wriiten as Hallgrimskirkja)। ইউরোপরে চার্চ গুলোর স্থপতির মধ্যে একটা আকর্ষণীয় ব্যাপার থাকে। ঠিক ধর্মীয় কারণে না, স্থপতি এবং জনপ্রিয়তার কারণে কিছু কিছু চার্চ আমার ভিসিট লিস্টে থাকে।
হ্যাকগ্রিমসকিরকা আইসল্যান্ডের মধ্যে সব চেয়ে বড়ো চার্চ এবং দেশের সব চেয়ে বড়ো স্থপতি। একচল্লিশ বছর সময় নিয়ে এই চার্চটি বানানো হয়। নকশাটা Trap Rocks , পাথরের তৈরী লম্বা লম্বা কলাম একটি আর একটির সাথে লাগানো, দুই পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট কলাম এবং ধীরে ধীরে মাঝখানে উঁচু লম্বা কলাম একসাথ হয়ে দেয়াল আকৃতির একটা পাহাড়ের রূপ ধারণ করে। চার্চটির নাম করণ করা হয় আইসল্যান্ডের কবি Hallgrímur Pétursson এর নামে।
চার্চের একেবারে উপরে উঠে পুরো Reykjavik শহরটা পর্যবেক্ষন করা যায়। সময় এবং খরচ সব কিছু ভেবে এইটার খুব একটা প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু চার্চের ভিতরে বিনামূল্যে প্রবেশ করা যায়। চার্চের গম্ভীর পরিবেশে কিছু ছবি তুলে রওনা দিলাম ব্লু-লেগুনে।
যাবার পথে রাস্তার দুইপাশে অপূর্ব সুন্দর Eldhraun lava field এবং তার উপর চাদরের মতো লেপ্টে আছে আইল্যান্ড এর কমন গাছ Moss.
আইসল্যান্ডের ভয়ঙ্কর ইতিহাসের ফল এইটা, যদিও চোখ জুড়ানো অপূর্ব সুন্দর দেখতে। ১৭৮৩ এর দিকে আগ্নেয়গিরিতে ভয়াবহ অগ্নুৎপাত হয়। তাতে অনেক মেষ এবং পালিত ঘোড়া মারা যায়। এবং বিস্ফোরণে যে গ্যাসটা ছড়ায় চারপাশে তাতে আইসল্যান্ডের আবহাওয়ার অনেক পরিবর্তন ঘটে, এবং অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এবং এই গলিত লাভা ধীরে ধীরে কুচকুচে কালো এবড়োথেবড়ো পাথরে পরিণত হয় এবং তার উপরে ধীরে ধীরে এই মস গুলো জন্মায় । বিস্তীর্ণ এই লাভা মাঠ দেখে মনে হয় পৃথিবীর মাঝে অন্য একটা গ্রহে আছি। এই বুঝি বিশাল বিশাল এলিয়েন তুলার মতো উড়ে উড়ে মাঠে এসে পড়বে।
ড্রাইভ করতে করতে এরই মধ্যে এসে পড়লাম ব্লু-লেগুন। টিভি, মুভি বা মাঝে মধ্যে পোস্টকার্ডে দেখতাম ধোঁয়াটে নীলাভ পানিতে সবাই নেমে হাঁটাহাঁটি করেছে আর হাতে একটা গ্লাস । কিন্তু এই সাদাটে নীলাভ পানি আর ধোঁয়ার ব্যাপার গুলো নিয়ে কিউরিয়াস ছিলাম না কখনো । যখন শেষ-মেষ এসে পড়লাম এই রকম একটি জায়গায়, তখন তো আর না জেনে রক্ষা নেই। এটা মানুষেরই তৈরী আরামদায়ক একটা থার্মাল বাথ। পাশে Svartsengi নামে একটা Geothermal পাওয়ার প্লান্ট আছে। এবং প্লান্টের টারবাইন ঘুরানোর জন্য গলিত লাভা প্রবাহ থেকে আসার অতি-উত্তপ্ত পানি ব্যবহার করা হয়, যেটা মিউনিসিপাল ওয়াটার হিটিং সিস্টেমের জন্য হিট দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্লান্টের হিট এক্সচেঞ্জের থেকে পানি এসে জমা হয় পৃথিবীর এই সবচেয়ে বড়ো লেগুনে, যেটা মূলত মানুষের রিক্রিয়েশন এবং Psoriasis নামে একটা চর্ম ব্যধি নিরামক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। লেগুনের পানি কতৃপক্ষ দুই দিন পর পর চেঞ্জ করে। টিকেটের সাথে একটা ড্রিঙ্ক ফ্রি ছিল।
ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে গরম পানিতে গলা পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা আর সাথে রেড ওয়াইন – আইডিয়াটা মন্দ হবে না। হাতে গ্লাস নিয়ে নেমে পড়লাম। অনেক মানুষের ভিড়। সালফার এর একটু হালকা গন্ধ। ঘরের শাওয়ারের পানি একসময় ঠান্ডা হয়, বার্থ টাবেও তাই। কিন্তু এই এখানে এই লেগুনের এর পানি যেহেতু ঠান্ডা হয়না, আর উঠেতে ইচ্ছে করছিলো না। তিন ঘন্টা কেটে গেলো। রাত এগারোটায় বন্ধ হয়ে যায়। আমি বোধহয় ১১:৪৫ পর্যন্ত ছিলাম ওখানে।
ব্লু-লেগুনে এন্ট্রি একটু এক্সপেন্সিভ। অনেকে আইসল্যান্ড ঘুরতে আসলে ব্লু – লেগুন স্কিপ করে, কেননা দামে কম আরো কয়েকটা থার্মাল বাথ আছে এরকম। পপুলারিটি-র জন্য এখানে দামটা অতিরিক্ত। যেহেতু খাবার দাবারের খরচ নিয়ে বেশ সঞ্চয়ী এবার , তাই নিজেকে একটু স্পইল করলাম এখানে।
আজকে আইসল্যান্ডে প্রথম দিন , দুপুর তিনটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত এইভাবে কাটলো। হোস্টেলে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেলো। বাইরে কমন রুমে অনেক ছেলে মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়। ছোট্ট রান্না ঘরে দুইটা স্টোভ এবং কয়েকজন লোক ওখানে। কারো সাথে কারো কথা নেই, কিন্তু সবাই যার যার মতো করে খাবার বানাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরা বেপারটা একটা নাটকের রিহার্সাল। স্পেস, টাইম মেইনটেইন করে যার যার কাজ সে সে করে যাচ্ছে মাইম করার মতো। ব্যাপারটা খুব মজার। হালকা স্প্যাগেটি খেয়ে রাতের সমাপ্তি ঘোষণা করলাম।
কাল সারা দিনের অনেক প্ল্যান।
People are always asking me about eskimos, but there are no eskimos in Iceland.
– Björk Guðmundsdóttir (an Icelandic singer)
(চলবে)
পরবর্তী (দ্বিতীয়) পর্বে থাকছে আইসল্যান্ডের কালো সৈকতে পরিত্যাক্ত Plane Wreck , ন্যাশনাল জিওগ্রাফি নোমিনেটেড ব্ল্যাক বীচ Reynisfjara, আইসল্যান্ডিক ঘোড়া আর waterfall Skógafossisfjara এবং Seljalandsfoss এর গল্প। ….

Related posts

ইতালিতে ঈদুল ফিতর পালিত

Irani Biswash

কৃষিযন্ত্র কিনতে কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে: কৃষিমন্ত্রী

Irani Biswash

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ২০০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগে আগ্রহ ইতালি

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »