অগাস্ট ১, ২০২১
MIMS TV
অভিমত জীবনধারা মুনীরউদ্দিন আহমদ

কে সুখী!

# মুনীরউদ্দিন আহমদ
সমাজের বহু মানুষ ভাবেন- অর্থকড়ি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিবাহ, সন্তানসন্ততি, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি মানুষকে সুখী করতে পারে। এসব জাগতিক অর্জন আসলে কি মানুষকে সত্যিকার অর্থে সুখী করতে পারে? এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সহজ নয়। সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছে যাদের কাছে সামাজিক মর্যাদা, গাড়ি, বাড়ি, অলংকার, কাপড়চোপড় বা ধনদৌলতের মতো সুখও এক ধরনের পণ্য। মনে হয়, এসব প্রাপ্তি মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা সুখ দিতে পারলেও প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী সুখের জন্য এসব অর্জন বড় ভূমিকা পালন করে না।
সুখ বৈষয়িক বা জাগতিক কোনো ব্যাপার নয়, সুখ বহুলাংশে মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার। সুখ অনেকাংশেই মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি অনুভূতি। মানুষ কে বা মানুষের কী আছে তার ওপর সুখ নির্ভর করে না। মানুষ কী ভাবে বা কীভাবে ভাবে, তার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সুখ। যার যা আছে বা যে অবস্থায় আছে তার জন্য শোকরিয়া জানিয়ে যদি দিন শুরু করা হয়, তাতে সুখ আসতে পারে। মানুষ আজ যা ভাবছে তার ওপর ভিত্তি করে তার ভবিষ্যতের সুখ গড়ে উঠবে। সুতরাং কাজকর্ম ও চিন্তাধারায় পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নিয়ে শুরু করলে জীবনে সুফল আসবে। আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, মর্যাদাবান, হৃদয়বান, সজ্জন, জ্ঞানীগুণী সৎ মানুষ সাধারণত সবসময় সুখী হয়। যারা শুধু নিতে চায়, দিতে জানে না বা চায় না, তারা সুখী হয় না।
সুখ প্রাপ্তির জন্য শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষও দিনের ২৪ ঘণ্টা সুখী হয় না বা থাকে না। সুখী মানুষের জীবনেও হতাশা, ক্ষোভ, দুঃখকষ্ট আসে। পার্থক্য হলো- সুখী মানুষরা হতাশা, দুঃখকষ্টকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে, অন্যরা পারে না।
আমাদের শরীর কোনো জড়বস্তু নয়, আমাদের মন আছে, আবেগ আছে, অনুভূতি আছে। আবেগ-অনুভূতি আমাদের শরীরের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। লোভ, লালসা, মোহ, ঈর্ষা, কাম ক্রোধ ও প্রতিহিংসা মানুষের দুঃখকষ্ট, অশান্তি, অসুখ ও ধ্বংস ডেকে আনে। সৃষ্টিকর্তার ওপর যার বিশ্বাস যত দৃঢ়, বস্তুজগতে তিনি তত সুখী। এটা অবশ্যই আধ্যাত্মিক আত্মত্যাগের কারণে।
সুখের বিপরীত শব্দ হলো অসুখ। যে সুখী নয়, সে অসুখী। অসুখ হতে পারে শারীরিক অথবা মানসিক। শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের জীবনে সুখ থাকে না। তবুও ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে শারীরিক অসুস্থতা বহুলাংশে সারানো যায়। কিন্তু মানুষ যদি মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তখন জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। কারণ মানসিক রোগ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রোগ। বর্তমান বিশ্বে লাখ কোটি মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বহু দেশে এর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। যার যার সুখ তাকেই সংশ্লেষণ (Synthesize) করে নিতে হবে। নতুন কাপড়-চোপড়, গাড়ি বাড়ি কেনা, চুরি, লুটতরাজ বা লটারির অগাধ টাকা অর্জন জীবনের সব দুঃখ দূর করে অনাবিল আনন্দ ও সুখ বয়ে আনবে এ ধরনের কল্পনা মানুষের চিন্তাশক্তিকে ভুল পথে পরিচালিত করে।
টাকা উপার্জন মানুষের জীবনে অভীষ্ট লক্ষ্য নয়, মানুষের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যের উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে টাকা উপার্জন। জগতে বাস করতে গেলে জাগতিক অর্জন সুখ-শান্তি আনতে একদম কোনো ভূমিকা পালন করে না- এ কথাটি ঠিক নয়। অর্থ সব সময় সুখ দিতে পারে না সত্যি; কিন্তু একজন মানুষ যখন অন্য সবার চেয়ে বেশি উপার্জন করেন, তখন তিনি ঠিকই নিজেকে সুখী মনে করেন। টাকা দীর্ঘ সময় সুখ এনে দিতে পারে না বটে, তবে টাকা ও অন্যান্য ধনসম্পদ সাময়িকভাবে মানুষকে তৃপ্ত করে।
ছোটকাল থেকে বইপুস্তকে পড়ে এসেছি, ‘অর্থই অনর্থের মূল’। অর্থ মানুষকে বেশি ব্যতিব্যস্ত রাখে, অর্থ মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এলে হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। আমরা এও পড়েছিলাম- ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে ক্ষণস্থায়ী হোক বা দীর্ঘস্থায়ী হোক, কোনো সুখই উপলব্ধি করা যায় না।
শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, লোভ-লালসা পরিত্যাগ করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করা, আনন্দ ও সন্তুষ্টি নিয়ে কাজ করা, রাগ-বিরাগ বা আবেগপ্রবণতা পরিত্যাগ করা, রোগ-বিমারি থেকে মুক্ত থাকা ও দাম্পত্যজীবনে সুখী হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসন্ততির সাথে সম্পর্ক অর্থবহ করে গড়ে তোলা। সবার মনে রাখা দরকার, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ও সুখী জীবনের জন্য বিবাহিত জীবনের যৌনসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিছু বাড়তি গুণাবলি অর্জন মানুষকে অধিকতর সুখী করতে পারে। আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও নিয়মিত প্রার্থনা করা জাগতিক সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। উৎসাহব্যঞ্জক হাস্যরসে ভরপুর ভালো বইপুস্তক ও ধর্মগ্রন্থ পড়া মানুষের মন মানসিকতাকে পবিত্র ও উদ্দীপিত করে। গরিব-দুঃখী ও দুস্থ মানুষকে দান করা এবং সেবা করার মাধ্যমে যে কেউ আত্মতৃপ্তি ছাড়াও আত্মিক সুখ লাভ করতে পারে। অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানবিক ধর্ম। নেই বলে আক্ষেপ না করে যার যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জীবনযাপন করা উচিৎ। সবাইকে নিয়ে হাসিখুশি থাকলে অবশ্যই মানুষ সুখী ও সুস্থ থাকতে পারে।
শেষ কথা- যে জীবনকে যত সহজভাবে নিতে জানে বা পারে, সে তত বেশি সুখী। মনে রাখা দরকার – আমরা এই পৃথিবীতে সবাই টুরিস্ট বা পর্যটক। কারো অবস্থান এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নয়।
# মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর এন্ড হেড, ডিপার্টম্যান্ট অব ফার্মেসী, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা 

Related posts

ইতিহাসের সাক্ষী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাণিজ্যিক স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

Irani Biswash

ঠাকুরগাঁওয়ে শিশির ভেজা ঘাসে শীতের আগমনী বার্তা

Mims tv : Powered by information

টিকা বিষয়ে কোনো আশা দেখাতে পারেননি ভারতীয় হাইকমিশনার

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »