অগাস্ট ১, ২০২১
MIMS TV
কোভিড ১৯ প্রিয় লেখক মু: মাহবুবুর রহমান

করোনা ভাইরাস: কারো রক্তের গ্রুপ কি করোনার ঝুঁকি নির্ধারণে সক্ষম

মু: মাহবুবুর রহমান
২০১৯ এর ১৭ই নভেম্বর থেকে করোনা ভাইরাস তার দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে। এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো থামানো যায়নি করোনার থাবা। আবার ভাইরাসটি যেভাবে একেকজন মানুষের দেহে ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ সৃষ্টি করছে তাতে রীতিমত বিস্মিত বিজ্ঞানীরা।
করোনাআক্রান্ত কেউ কেউ অত্যন্ত দ্রুত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কারো দেহে দেখা যাচ্ছে খুবই মৃদু উপসর্গ। আবার কারো ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস পজিটিভ বলে নিশ্চিত হবার পরও কোন উপসর্গই দেখা যাচ্ছে না। তাই এই প্রশ্নটা বারবারই ঘুরে ফিরে আসছে – করোনাভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ হবার ঝুঁকি কার ক্ষেত্রে কতটা?
এ নিয়ে চলছে গবেষণা, প্রতিনিয়তই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করছেন। সম্প্রতি কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে, মানুষের রক্তের গ্রুপ বা টাইপের সাথে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্পর্ক আছে। যদিও প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা রক্তের গ্রুপের সাথে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক আছে বলে মনে করতেন না।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ‘এ’ ব্লাড গ্রুপের মানুষের মধ্যে কোভিড-১৯ সহজে সংক্রমিত হয় এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তাদের সবচাইতে বেশি। অপরদিকে, যাদের ব্লাড গ্রুপ ‘ও’, তাদের মধ্যে এ রোগ সংক্রমণের হার কম এবং তারা সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে রয়েছেন। সুখের কথা হলো, পৃথিবীতে রক্তের ‘ও’ গ্রুপধারী মানুষের সংখ্যা রক্তের ‘এ’ গ্রুপধারী মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানা যায়।
কোভিড-১৯ এবং রক্তের গ্রুপ নিয়ে গবেষণার ফল
সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে কানাডার বিজ্ঞানীরা জানান, যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ কিংবা আরএইচ নেগেটিভ তাদের করোনা ঝুঁকি অন্য রক্তের গ্রুপধারী মানুষের চেয়েও কম।
কানাডার ২ লাখ ২৫ হাজার ৫৫৬ জন মানুষের রিপোর্ট যাছাই বাছাই করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন কানাডার গবেষকরা। রক্তের গ্রুপ ‘ও’ কিংবা আরএইচ নেগেটিভ এমন ব্যক্তিদের অন্যদের চেয়ে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি ১২ ভাগ কম বলে জানান তাঁরা। ‘এ’, ‘এবি’ কিংবা ‘বি’ রক্তের গ্রুপধারীদের চেয়ে ‘ও’ কিংবা আরএইচ নেগেটিভ ব্যক্তির তীব্র মাত্রায় করোনা সংক্রমণ বা মৃত্যুর ঝুঁকি ১৩ ভাগ কম বলেও গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২৪ নভেম্বর এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে অ্যানালস অব ইন্টারন্যাল মেডিসিন সাময়িকীতে। গবেষণার রিপোর্টে বলা হয়, যেসব মানুষের রক্তে ‘ও’ কিংবা আরএইচ-নেগেটিভ থাকে তারা কিছুটা সুরক্ষিত থাকবেন। বিশেষ করে, যাদের দেহে ‘ও-নেগেটিভ’ রক্ত আছে, তাদের ঝুঁকি অনেক কম।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক জেনেটিক টেস্টিং জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ২৩অ্যান্ডমি (23andMe) রক্তের গ্রুপের সঙ্গে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যোগসূত্র রয়েছে বলে জানিয়েছিল।
১০ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজউইক ম্যাগাজিন ঐ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে রিপোর্ট করেছিলো। তারা জানিয়েছিল সাড়ে সাত লাখ মানুষের উপর চালানো গবেষণায় দেখা যায় যাদের ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ (O) তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার অন্যদের তুলনায় ৯ থেকে ১৮ শতাংশ কম। স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য ফ্রন্টলাইনারদের মধ্যেও দেখা গেছে যাদের ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ (O) তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার অন্যদের তুলনায় ১৩ থেকে ২৬ শতাংশ কম। শুধু তাই নয়, যাদের ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ (O) তাদের হাসপাতালে ভর্তির হারও কম।
এছাড়া কোভিড-১৯ রোগের উৎসস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের ‘এ’ গ্রুপধারী ব্যক্তিদের মধ্যে করোনা ভাইরাস সহজে সংক্রমিত হতে পারে। ১৮ মার্চ যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলিমেইল এ গবেষণার ফল নিয়ে রিপোর্ট করেছিলো । মার্চে উহান শহরের ২ হাজার ১৭৩ জন কোভিড-১৯ রোগী নিয়ে গবেষণা করে চীনা বিজ্ঞানীরাও জানিয়েছিলেন, যাদের ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ (O), তাদের মধ্যে এ রোগ সংক্রমণের হার কম। আর রক্তের ‘এ’ (A) গ্রুপধারী ব্যক্তিদের মধ্যে করোনাভাইরাস সহজে সংক্রমিত হতে পারে। তাদের মধ্যে মৃত্যুর হারও বেশি।
মানুষের রক্তের গ্রুপ চারটি- এ, বি, এবি এবং ও। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত অধিকাংশ গবেষণার ফলাফলই বলছে ‘এ’ গ্রুপের রক্তধারী  মানুষের করোনা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি আর সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে আছে ‘ও’ গ্রুপের রক্তধারী মানুষ। যদিও গবেষণার ভিন্ন ফলও আছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা দ্য ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন অ্যাডান্সেস সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ গত ১২ জুলাইয়ের গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, করোনার বিস্তার ও সংক্রমণের গভীরতার ওপর ব্লাডগ্রুপের কোন প্রভাব নেই। কিন্তু তারা স্বীকার করে যে, ‘এ’ গ্রুপের কারও কারও শরীরে এই ভাইরাসটি খুবই মারাত্মক রূপ ধারণ করছে।
ভাইরাসের সাথে রক্তের গ্রুপের সম্পর্ক
মানুষের রক্তকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়: এ (A), বি(B), এবি(AB) এবং ও(O)৷ এ পর্যন্ত প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী ‘এ’ রক্ত বহনকারীদের কোভিড-১৯ এ ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি৷ অন্যদিকে ‘ও’ রক্তধারীদের এমন ঝুঁকি অনেকটাই কম৷ এখন গ্রুপভেদে রক্তের বৈশিষ্ট্যগুলো একটু দেখে নিই।

উপরের ছবিটি দেখে আমরা বুঝতে পারি যে প্রতিটি গ্ৰুপের রক্তেরই কিছু বৈশিষ্ট্যগত উপাদান রয়েছে। যেগুলো হল এন্টিবডি আর এন্টিজেন। এই অ্যান্টিবডিগুলি আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রতিরোধী ব্যবস্থার অংশবিশেষ। আর অ্যান্টিজেনগুলি তৈরি হয় শর্করা আর প্রোটিন দিয়ে।
সাধারণত প্রধান চারটি রক্তের গ্রুপের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়।
রক্তের গ্রুপ এ-লোহিত রক্ত কণিকায় এ অ্যান্টিজেনের সাথে প্লাজমায় বি অ্যান্টিবডি রয়েছে।
রক্তের গ্রুপ বি– প্লাজমায় অ্যান্টি-এ অ্যান্টিবডির সাথে বি অ্যান্টিজেন রয়েছে।
রক্তের গ্রুপ এবি– যার এ ও বি উভয়ই অ্যান্টিজেন রয়েছে তবে অ্যান্টিবডি নেই।
রক্তের গ্রুপ ও– কোনো অ্যান্টিজেন নেই। তবে প্লাজমায় অ্যান্টি-এ ও অ্যান্টি-বি অ্যান্টিবডি উভয়ই রয়েছে।
করোনাভাইরাস সম্পর্কিত পূর্ববর্তী করা সকল গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ও’ গ্রুপের রক্তে যে অ্যান্টিবডি রয়েছে তা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরীরকে সহায়তা করে। অথবা বলা যেতে পারে, করোনা হয়তো ‘এ’ গ্রুপ রক্তের উপাদানের রূপ সহজেই গ্রহণ করতে পারে তাই তাদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। অপরদিকে ‘ও’ রক্তের গ্রুপে দুই ধরণের এন্টিবডি থাকায় করোনা হয়তো সেখানে একটু বাঁধার সম্মুখীন হয়। তবে বলে রাখা ভালো পুরো বিষয়টাই এখনো হাইপোথিসিসের (ধারণা)   উপর দাঁড়িয়ে আছে।   এই গবেষণাগুলোর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীরাও  বলছেন, রক্তের গ্রুপ করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির পেছনে প্রধান কারণ কিনা, বা এর পেছনে অন্য কোন জেনেটিক উপাদান কাজ করছে কিনা – তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্‌স জেনারেল হসপিটালের অধ্যাপক চিকিৎসক অনহিতা দুয়া বলেন, ‘‘এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে না, করোনা সংক্রমণ আমাদের দেহে ভয়াবহ হয়ে ওঠার ক্ষ‌েত্রে শুধু রক্তের নির্দিষ্ট কোনও গ্রুপেরই ভূমিকা রয়েছে। একটা ‘কোরিলেশন’ বা ‘অ্যাসোসিয়েশন’ (পারস্পরিক সম্পর্ক) খুঁজে পাওয়া গিয়েছে মাত্র। শুধুমাত্র জিন-স্তরে। আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে এটাও অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই বলব, ‘এ’ গ্রুপের রক্তবাহকদের অযথা আতঙ্কিত হয়ে ওঠার কারণ নেই। আবার এটাও বলব না, ‘ও’ গ্রুপের রক্তবাহকরা খুব স্বস্তিতে থাকতে পারেন। এটা একটা হাইপোথিসিস(ধারণা)। কোনও থিয়োরি (তত্ত্ব) নয়। কোনও মডেলও নয়।’’
যাই হোক, বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য যেসব সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় – তা পালন না করার জন্য রক্তের গ্রুপ নিয়ে গবেষণার ফলকে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। রক্তের গ্রুপ আমাদের বাঁচাতে পারবে না। যতদিন না আমাদের হাতে করোনা ভ্যাকসিন আসছে, এই মহামারী থেকে কেবল ও কেবলমাত্র  সচেতনতাই পারবে আমাদের বাঁচাতে। তাই সম্পূর্ণ না জেনে সোশ্যাল মিডিয়ার মুখরোচক শিরোনামে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। সবার আগে চাই সচেতনতা।
# মু: মাহবুবুর রহমান, ফার্মাসিস্ট, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

Related posts

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দলের সকলে করোনা নেগেটিভ

Irani Biswash

পামারস্টোন নর্থের নতুন সিটি কাউন্সিলর অর্ফি মিকালাড যিনি একজন শরণার্থী বা রিফুইজি

Mims tv : Powered by information

চট্টগ্রামে পুলিশের ব্যতিক্রমী ফ্রি ঈদ মার্কেট

Irani Biswash

Leave a Comment

Translate »